পাখালিনামা
লেখক – রূপঙ্কর সরকার
সম্পাদনা – সুমেরু মুখোপাধ্যায়
শিল্পনির্দেশনা – সায়ন্তন মৈত্র
বই নকশা – ময়াঙ্ক রাই
প্রচ্ছদপট – লুয়েত ভেলরই, পল রডেন
পৃষ্ঠা – ২৮৮
হার্ড বাউন্ড, কাপড়ে বাঁধাই
মূল্য – ৪৫০ ভারতীয় টাকা
ISBN – 978-81-933223-4-5

সৌন্দর্যায়নের ঠেলায় কলকাতা এখন গ্রীন ডেজার্ট। প্রায় চারদশক আগে থেকেই আলিপুর চিড়িয়াখানার পথ মাড়ায় না পরিযায়ী পাখির দল। লবণহ্রদে একসময় খেলত বিদ্যাধরীর জোয়ার, মাছের লোভে কাতার দিত পাখি। সখের শিকারীরা সেসব শেষ করে দিয়েছেন অনেকদিন, অবশিষ্ট মুছেছে নগরায়ন। বেঁচে থাকা সামান্য সবুজে আশ্রয় নেয় উদ্বাস্তু পাখিরা। তাদের খাদ্যের যোগানে অসমর্থ শহরের ধুলো ঢাকা গাছ। পাখিদের ডিম ও বাচ্চারা খাদ্য শহরের হিংস্র পশুদের। ধীরে ধীরে পাখি শূন্য হচ্ছে কলকাতা।

কী হবে পাখি দিয়ে? ছড়ায়, গানে, ধর্মে, লোকগাথায় পাখিদের উল্লেখ যুগ যুগ ধরে। সাহিত্য বা বিনোদনের বাইরেও পাখির ভূমিকা সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে ‘পাখালিনামা’য়। শস্য উৎপাদনে ফুলের পরাগমিলন থেকে বীজ প্রসারণ। কীটনাশকের কাজও করে থাকে পাখিরা। এ বইয়ে আছে শহরের ঝাড়ুদার পাখিদের কথা, এমনকি মাছের নিষিক্ত ডিম বন্টনে পাখিদের অপরিহার্য ভূমিকার কথা। আছে আবহাওয়ার পরিবর্তনের খবর কেমন করে এনে দেয় পাখিরা।  ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার তরাজুতে পাখিদের সংকটকে মেপেছেন লেখক পরিবেশের বিপন্নতার এককে। শুনিয়েছেন সেই অমোঘ কথা, পাখি না থাকলে কেমন করে মানুষও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে একদিন।

রূপঙ্কর সরকার

জন্ম ১৬ই অগস্ট ১৯৪৮ । অবসরপ্রাপ্ত চাকুরে। নেশা পাখি বিষয়ক চর্চা, উৎসাহী নিরন্তর ভ্রমণে। বর্তমানে বছরের অধিকাংশ সময় কাটে পাখির পিছনে ছুটে ও তাদের ছবি তুলে। এক সময়ের নাট্যকার ও পরিচালক। নিয়মিত লেখেন ছোটগল্প।

প্রকাশিত বই― ধানাইপানাই,  নামান্তর, অপ্রাকৃত, নিভৃতে যতনে, অপ্রাকৃত ২।

 

 

বইয়ের কথা

নেহাত অন্ধ নয়ন শ্রবণ কালা না হলে বোঝা যায় নেই নেই করেও আমাদের গা-ঘেঁষাঘেঁষি যত পাখপাখালির মেলা, তারা আমাদের এই কৃপণের মতো বেঁটে দেওয়া জীবনের বেশ অনেক ক’টাকে বৈচিত্রে ভরিয়ে রাখতে পারে। কেবল কাকের অলস ধুরন্ধরতাই দেখে শেষ করা যাবে না! একজন পক্ষিপ্রেমী, সাহিত্যসেবী ও আলোকচিত্রীর সাত দশক জোড়া জীবনের অভিজ্ঞতা জড়ো করে লেখা এই বইটি তার প্রমাণ। এ বইয়ের পাখিরা গহন অরণ্যকন্দরের গোপনচারী নয়, তারা পাড়াতুতো চেনা-মুখ। আর বইটিও নয় অ্যাকাডেমি-গন্ধী বিদ্যে ওগরানো অনুশীলন। মহা আনন্দে কাক-চড়াই-শালিখ-চিল-পায়রা-টিয়া-ময়ূর-হাঁস-দোয়েল-ফিঙে-শকুনের কীর্তিকলাপ নিজের চোখে যেমনটা দেখেছেন চারপাশে আড্ডার বাতাস বইয়ে দিয়ে তা হাজির করেছেন তিনি। পাখিদের আচার-আচরণ নিয়ে ঘটনা-অঘটনার স্বাদু মিশেল। এম কৃষ্ণন ও রঞ্জিত লাল, প্রতিবেশী প্রাণীকুলের আচার-আচরণ নিয়ে আরও দুই উল্লেখ্য লেখকের রচনার কথা মনে পড়ালেও রূপঙ্করের রচনার ধরন আলাদা। নজরটিও অসাধারণ। কে ভেবেছিল একটা বিশেষ ব্র্যান্ডে অভ্যস্ত কাকেদের কখনও অন্য বিস্কুটে  অরুচি হতে পারে! আড্ডার রীতি মেনে কথায় কথায় সাহিত্যের বিভিন্ন আঙিনা থেকে উঠে এসেছে পাখিদের নানা উল্লেখ। আখ্যানে মিথে শিল্পিত সৃজনে পাখিরা তাদের মতো হয়েও অন্যতর ভাবে উপস্থাপিত। পাখিরা যে আসলে আমাদের জীবনের সঙ্গেই সম্পৃক্ত, আমাদের জীবনেরই একটা পরত, এই সচরাচর অননুভূত সত্যটাকে ভারী উপভোগ্য করে পাওয়া গেল এই বইতে, একটা স্বচ্ছন্দ অনুচ্চকিত কথনভঙ্গিতে। আজকের পরিবেশে এদের টিকে থাকা কেন দুরূহ হয়ে উঠছে সে দিকেও নজর ফেরানো হয়েছে। নান্দনিক বৈশিষ্ট্যে বইটি আলাদা খ্যাতি পাবে। গ্রন্থসজ্জায় আছে বিশেষ চিন্তার ছাপ, আছে চমৎকার অলঙ্করণ। কিন্তু সমস্যা হল, সে সবের কয়েকটি বসেছে প্রসঙ্গচ্যুত, কখনও বা চিত্রিত পাখিটি এ বইতে অপ্রাসঙ্গিক, কোনও ছবিতে চিত্রপরিচিতি নেই। নেই শিল্পীর নাম। মুদ্রণ সংক্রান্ত তথ্যে অনেকের স্বীকৃতি আছে, কিন্তু ব্যবহৃত শব্দটি থেকে তাঁদের ভূমিকার চরিত্রটা স্পষ্ট বোঝা যায় না। মুদ্রণপ্রমাদ আগাগোড়া গর্জনশীল।

(আনন্দবাজার পত্রিকা পুস্তক পরিচয়)

পাখিদের চিরকাল ঠাঁই দিয়ে এসেছি আমাদের প্রতি দিনের জীবনে, গানে, কবিতায়, গদ্যে। আবহাওয়া পরিবর্তনের খবর এনে দেওয়া থেকে শস্য উৎপাদনে, কীটনাশকের কাজে, মায় জঞ্জাল সাফাইতেও অপরিহার্য পাখিরা আজ বিলুপ্তির পথে। পাখির পিছনে ছুটে, ছবি তুলে যাঁর দিন কাটে সেই রূপঙ্কর সরকারের কলমে পরিবেশের এই বিপন্নতা, সঙ্গে স্কেচ। পাখালিনামা  (৯ঋকাল বুকস্‌। ৪৫০.০০)।

(আনন্দবাজার পত্রিকা পুস্তক পরিচয়)