খ্যাটন সঙ্গী
লেখক – দামু মুখোপাধ্যায়
প্রচ্ছদ ও অলংকরণ – স্মারক রায়
সম্পাদনা – সুমেরু মুখোপাধ্যায়
শিল্পনির্দেশনা – সায়ন্তন মৈত্র
বই নকশা – ময়াঙ্ক রাই
অতিরিক্ত সংযোজন – খাদ্য সফর, বিবলিও পাড়া, নেটরাস্তা
পৃষ্ঠা – ৪৩২
হার্ড বাউন্ড, কাপড়ে বাঁধাই
মূল্য – ৫০০ ভারতীয় টাকা
ISBN – 978-81-933223-0-7































 



 

খাইয়ে হিসেবে বাঙালির দেমাক খুব। চব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয়র এমন সমঝদার না কি ভূ-ভারতে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আবার ভ্রমণের নেশাও তার বিস্তর। বেড়াতে বেরিয়ে হকেনকে কিছুমিছু মুখে ফেলা চাই-ই চাই। তা বলে স্রেফ নোলার টানে সফর? পর্যটকের সফর পরিকল্পনায় ‘ফুড ট্যুরিজম’ বা রসনার খোঁজে বিশেষ ভ্রমণ তুলনামূলক নতুন কনসেপ্ট। বেড়াতে বেরিয়ে ‘ভোজনং যত্রতত্র শয়নং হট্টমন্দিরে’ বুলি আউড়ে চরকিপাক খাওয়াই দস্তুর। পেটের খোরাক নিয়ে বিশেষ চিন্তা-ভাবনার অবকাশ থাকে না– প্রচলিত ধারণা এমনই। কোনও বিশেষ সুখাদ্যের সন্ধানে পাহাড়-জঙ্গল-মরুভূমি-সাগর চষে ফেলা কিংবা ভিনরাজ্যে গিয়ে নিত্যি মাছ-ভাতের ঠিকানা জরিপ না করে সে তল্লাটের হেঁশেলেই উঁকিঝুঁকি মারা বাঙালির জীবনে নতুন। নিদেন, স্মৃতির গলিপথ ঢুঁড়ে সাবেক রসনাবিলাসের তত্ত্ব-তালাশে মগ্ন বান্দার হদিশ সহজে মেলে না। বাংলা সাহিত্যে ‘ফুড ট্যুরিজম’ বিশেষ চর্চিত বিষয় করে তোলার পরিকল্পনাতেই তৈরি খ্যাটন সঙ্গী।

কথায় বলে, গতস্য শোচনা নাস্তি। তাই চেনা গৎ ছেড়ে শুধু জিভের বালাই মেনে অদেখা যাত্রাপথের সন্ধান এই কেতাবে। চলতে চলতে ধাঁধা লাগে, এ পথে অতীতে কোনও অভিযাত্রী কি আদৌ পা বাড়িয়েছেন? বে-আক্কেলের আস্পদ্দা দেখে পুঁথি-নথি-দলিল-দস্তাবেজে মুচকি হাসেন পূর্বসুরীরা। তাঁদের সেলাম জানিয়ে হা-ক্লান্ত রসনাপথিক শেষমেশ আশ্রয় পায় বিবলিওপাড়ার নিশ্চিন্দিপুরে। ছপ্পন ভোগ না সাড়ে বত্রিশ ভাজা, আপনার পছন্দ যাই হোক এখন থেকে বাঙালির প্রতিটি সফরে খ্যাটন সঙ্গী আবশ্যক।

দামু মুখোপাধ্যায়

পৃথিবীর আলো দেখা ইস্তক কলকাতার বাসিন্দা। শিক্ষা-দীক্ষার খতিয়ান পেশ করে ঘোরতর বিড়ম্বনার সন্মুখিন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে তা আপাতত উহ্য। রোজগারের ধান্দায় নানান বিদঘুটে পেশায় নাজেহাল হওয়ার পরে মধ্যবয়েসে চাকরিজীবনে কিছুটা ধাতস্থ হওয়ার সুযোগ হয়। নোলা-সর্বস্ব জীবন। যে কোনও মুলুকের হরেক কিসিম পদ চেখে দেখার নেশা আশৈশব বজায় থেকেছে। খাবার-দাবার নিয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও ছুঁৎ‌মার্গ গজিয়ে ওঠার সুযোগ পায়নি। পাকযন্ত্র চালু রাখা বাদে আরও বেশ কিছু বদভ্যাস সযত্নে লালিত। হকেনকে খুন্তিবাজিতে সহবাসীদের যথাসম্ভব নাকাল করে তৃপ্তিলাভ হয়। এছাড়া জুতসই বিষয় ও দোসর মিলে গেলে হাতের কাজ ফেলে রেখে খোশগল্পে জুটে হল্লা করার দুর্নাম সেই স্কুলবেলা থেকে সারিবাদি সালসার লেবেলের মতো গায়ে সেঁটে গিয়েছে।

ইনসমনিয়ার খাতিরে রাত জেগে নাগালে আসা সব রকম বই-পত্তর ঘাঁটাঘাঁটি করার বাতিক রয়েছে। দীর্ঘ অনভ্যাসের ফলে তাতে হাঁফ ধরলে তল্পিতল্পা গুটিয়ে নিরুদ্দেশ হওয়ার কুমতলব হামেশাই প্রেরণা দেয় লেখালিখির। যদিও লেখালেখির বাতিক কোনওকালেই বিশেষ ছিল না, শেষে দায়ে পড়ে এপথে পা বাড়ানো। সে সমস্ত হাবিজাবি যখন পাঠকের লাই পেয়ে দু’ মলাটের ভিতর ব্যবস্থা হল, তখন ইষ্টনাম জপ করা একমাত্র উপায়।

বইয়ের কথা

পিতৃদত্ত নামের ওপর কারও হাত থাকে না বটে, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ছদ্মনামের বিচার করা সমালোচকের অধিকারের মধ্যে পড়ে। পেটুক হিসেবে যদি খ্যাতি পেতেই হয়, তবে দামু নামখানা মোক্ষম, সন্দেহ নেই। নামের প্রতি সুবিচার করেছেন দামু মুখোপাধ্যায়। তাঁর খ্যাটন সঙ্গী-র পাতায় পাতায় হরেক কিসিমের খাওয়ার গল্প, হরেক ঠিকানায়। শহর কলকাতার অলিগলি থেকে জঙ্গলমহলের শাল-মহুলের বন, ক্যানিং লাইনের তালদি থেকে ঘণ্টাদেড়েক দূরের গ্রাম, যেখানে পৌঁছতে ভ্যানরিকশার পঁয়তাল্লিশ মিনিটের প্রবল ঝাঁকুনি সহ্য করা ছাড়া গত্যন্তর নেই, রেলের প্যান্ট্রি থেকে দার্জিলিং-এর পাব, নামবিহীন ধাবা থেকে চায়না টাউন— ভোজনং যত্রতত্র কথাটাকে একেবারে আক্ষরিক করে ছেড়েছেন দামু। সে রসনাবিলাসের অভিজ্ঞতাকে জারিয়েছেন সেন্স অব হিউমারে, পরিবেশন করেছেন মুচমুচে বাংলায়।

এই বইয়ের একটা বড় অংশ যাঁদের নিয়ে, পণ্ডিতরা তাঁদের সাবঅল্টার্ন বলেন। কার্শিয়াং-এর গেস্ট হাউসের চৌকিদার পবন বাহাদুর, শিমলিপালের দুখিয়া মাহাতো, শালবনির কুন্দখুড়ো, চা-বাগানের পিটার ওরাওঁ, পাড়ার গুংগাদা, গাছবুড়ো মন্মথ দলুই, আর নিজের শৈশবের বাড়ির কমলাবুড়ি, দেবীপিসি, বৃহস্পতিমাসি, শিউপূজন ভাইয়া— যাঁরা চির কাল কাব্যে উপেক্ষিত, এখানে তাঁরাই নায়কনায়িকা। সুন্দরবন থেকে আসা নিরক্ষর রাঁধুনিমাসি রেঁধে ফেলতেন নিখুঁত পার্কসার্কাস ঘরানার চাঁপ, উত্তর পঞ্চান্নগ্রাম বাজারের অনামা দোকানদার বানিয়ে দিতেন পেঁয়াজ-রসুন-সেলারি সহযোগে স্বর্গীয় ককটেল সসেজ। ভাল খাওয়ার সঙ্গে যে মোটা মানিব্যাগের সম্পর্ক তেমন অবিচ্ছেদ্য নয়, বরং এলোমেলো ঠিকানায় অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তির অভিঘাত মনে থেকে যেতে পারে বেশ কয়েক জন্ম, দামু মনে করিয়ে দিয়েছেন।

এবং, বাঙালি যে সর্বভুক, এই বাজারে বুক ঠুকে এমন কথা লিখে ফেলতে পারার জন্য একটা সাবাশ তাঁর প্রাপ্য। তাঁর উদরসফরের অনেকখানি জু়ড়ে রয়েছে শুয়োরের মাংস এবং গোমাংস। পাশেই রয়েছে পুজোর ভোগের অমোঘ আমন্ত্রণ, হরিদ্বারের দুধ-জলেবির গন্ধ। হরেক মাছের কিস্‌সার সঙ্গেই সহাবস্থান তিরাশি বছরের পুরনো কেকের দোকানের স্মৃতিমাখা স্বাদের। রয়েছে পুরনো স্কচ আর ডাবের জল-লেবু মেশানো বাংলার নিশ্চিন্ত সহাবস্থান।

খেয়েই যদি মরতে হয়, তবে সব খেয়ে মরাই তো ভাল!

(আনন্দবাজার পত্রিকা পুস্তক পরিচয়)

রকমারি রান্না আর খাওয়াদাওয়ার স্মৃতির গায়ে লেপ্টে থাকে যে আশৈশব সুঘ্রাণ, তারই সুলুক সন্ধানে দিগ্‌বিদিক চষে ফেলার কিস্‌সা দামু মুখোপাধ্যায়ের খ্যাটন সঙ্গী-তে (৯ঋকাল। ৫০০.০০)। স্মারক রায় চিত্রিত এ বই বাংলা সাহিত্যে ‘ফুড ট্যুরিজম’ চর্চার পরিকল্পনায় তৈরি।

(আনন্দবাজার পত্রিকা পুস্তক পরিচয়)